গর্ভাবস্থায় রোজা রাখার সময় ইফতার ও সেহরিতে সঠিক খাবার নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময় মা ও গর্ভে থাকা শিশুর পুষ্টি এবং চাহিদা একসঙ্গে পূরণ করতে হয়। তাই মা যদি সঠিক খাবার বেছে নেয়। তাহলে সেটি মা এবং গর্ভের শিশুকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
এছাড়াও মায়ের শরীরে পানিশূন্যতা কমে এবং শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। তাই সকল গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টিকর, সুষম ও সহজপাচ্য খাবারের তালিকা জানা জরুরি।
এ বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকা, যেটি হতে পারে একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য কার্যকরী উপায়। গর্ভাবস্থায় একজন মা ইফতার ও সেহরিতে কি কি খাবার খাবেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক।
গর্ভাবস্থায় ইফতার ও সেহরিতে যা খাবেন
গর্ভাবস্থায় যদি কিছু সঠিক নিয়ম মেনে চলেন। তাহলে মায়ের শরীরের পাশাপাশি গর্ভের সন্তানের স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে। গর্ভাবস্থায় একজন নারীর পানির চাহিদা প্রচুর রয়েছে। একজন স্বাভাবিক মানুষ যদি দৈনিক আড়াই লিটার পর্যন্ত পানি পান করে। তাহলে একজন গর্ভবতী নারীকে দ্বিগুণ পানি পান করতে হবে।
তাই রমজান মাসে একজন গর্ভবতী নারীকে পানির পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে। একজন গর্ভবতী নারী যদি সঠিক খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি পান করে। তাহলে মায়ের শরীরের পাশাপাশি গর্ভে থাকা সন্তানের শরীর সুস্থ থাকবে।
প্রথম ট্রাইমেস্টার (Trimester) অর্থাৎ, ১ থেকে ৩ মাস পর্যন্ত একজন গর্ভবতী নারী স্বাভাবিকের তুলনায় কম খাওয়া-দাওয়া করে থাকেন। কিছু খেলেই বমি হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে একজন গর্ভবতী নারীকে পানির পাশাপাশি পর্যাপ্ত সুষম খাবার খেতে হবে।
গর্ভাবস্থায় ডালের পরিবর্তে সবজি ও মাংসে কম মসলা দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে খেতে পারেন। অথবা দই ও চিড়া একসঙ্গে খেতে পারেন। তাছাড়াও ১/২টি ডিমের পাশাপাশি হাফ গ্লাস দুধের সাথে তোকমা মিশিয়ে পান করতে পারেন। তাহলে গর্ভবতী মায়ের শরীরের দুর্বলতা কমবে। মায়ের শরীরের পাশাপাশি গর্ভের সন্তানের স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে।
এছাড়াও সেহরিতে একজন গর্ভবতী নারীকে ২/৩টি খেজুর রাখা উচিত। ইফতারের সময় প্রথমে একজন গর্ভবতী মাকে খেজুর এবং পানি পান করে কিছুটা সময় বিরতি নিতে বলা হয়েছে। একজন গর্ভবতী নারীকে ধীরে ধীরে খাবার খেতে হবে। এতে করে খাবারগুলো সঠিকভা ডাইজেস্ট হবে।
পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকা বলেন যখনি আপনি রোজা রেখে সারাদিনের ক্লান্তিতে ইফতারিতে একসঙ্গে অনেক বেশি খাবার এবং পানি পান করবেন। তখনি আপনার শরীর খারাপ এবং বমি হতে শুরু করবে। তাই অবশ্যই একজন গর্ভবতী নারীকে ধীর গতিতে খাবার ও পানি পান করতে হবে।
অনেক সময় আমরা ইফতারিতে চিনির পানির পাশাপাশি দোকানের বিভিন্ন কালারের ফুড জুস খেয়ে থাকি। এটি শরীর খারাপের পাশাপাশি গ্যাস তৈরি করে। তাই অবশ্যই একজন গর্ভবতী নারীকে ইফতারিতে সাদা পানি পান করতে হবে।
এছাড়াও গর্ভবতী নারীকে ইফতারিতে সঠিক খাবার নির্বাচন করতে হবে। একজন গর্ভবতী নারী ইফতারিতে ভাত, মাছ, মাংস এবং সবজি দিয়ে ইফতারি শেষ করতে পারেন।
ইফতারির দেড় থেকে দুই ঘন্টা পরে একজন গর্ভবতী নারী পরিমাণ মতো সিজনাল বা মৌসুমী ফল খেতে পারেন। যেটি মা এবং গর্ভে থাকা সন্তানের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। যেমন: তরমুজ, আপেল, বরই, লেবু, কমলা ও মালটা ইত্যাদি।
আবার অনেকে গর্ভবতী মায়ের অনেক খাবার থেকে গ্যাস তৈরি হয়। তাই অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে কোন খাবার থেকে গর্ভবতী মায়ের শরীরে গ্যাস তৈরি হচ্ছে। সেই খাবারটি তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে।
পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকার মতে, একজন গর্ভবতী নারীকে আনারস এবং পাকা পেঁপে এড়িয়ে চলা উচিত। এতে গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে। এছাড়াও একজন গর্ভবতী নারীর জন্য আপেল, নাশপাতি, তরমুজ এবং পাকা কলা খুবই উপকারী।
একজন গর্ভবতী নারী লেবুর শরবতের পরিবর্তে ডাবের পানি, আখের রস এবং কমলার জুস ইত্যাদি খেতে পারেন। এছাড়াও সালাদ হিসেবে শশা, গাজর, বাদাম, টমেটো দিয়ে সালাদ তৈরি করে খেতে পারেন। এছাড়াও একজন গর্ভবতী নারী রাতে ঘুমানোর আগে টমেটো স্যুপ, সবজি স্যুপ এবং চিকেন স্যুপ ইত্যাদি খেতে পারেন।
একজন গর্ভবতী নারী ইফতারের পর থেকে রাতে ঘুমানোর আগে পর্যন্ত একটি ডিম এবং অন্যান্য কোনো প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন। একজন গর্ভবতী নারীর শরীরে অবশ্যই প্রোটিন থাকা প্রয়োজন। যাতে করে গর্ভের সন্তানের গ্ৰোথ এবং মায়ের শরীর সুস্থ থাকে।
সাধারণত একজন গর্ভবতী মহিলার প্রথম ট্রাইমেস্টারে ক্যালোরি কম থাকে এবং দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে ক্যালোরির পরিমাণ বেশি থাকে। তাই একজন গর্ভবতী নারীকে ক্যালোরির পরিমাণ আস্তে আস্তে বাড়তে হবে।
একজন গর্ভবতী নারী যদি ইফতারিতে দুধ না খেতে পারেন। তাহলে দই দিয়ে খাবার তৈরি করে খেতে পারেন। এছাড়াও ঘি দিয়ে ভাত, ডিম, সবজি একসাথে ভেঁজে খেতে পারবেন।
আয়েশা সিদ্দিকা আরোও বলেন একজন গর্ভবতী নারীকে এমনভাবে খাবার নির্বাচন করতে হবে। যাতে করে গর্ভবতী নারী শরীর সুস্থ থাকে এবং গর্ভের সন্তানের পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন পায়।
গর্ভাবস্থায় আপনি যদি আলাদা আলাদা খাবার নির্বাচন করেন। তাহলে সবধরনের ভিটামিন আপনার শরীরে যুক্ত হবে। এছাড়াও গর্ভবতী নারীকে পর্যাপ্ত খাবারের পাশাপাশি দৈনিক ৮ ঘন্টা ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।

